ঢাকা | বঙ্গাব্দ

শিক্ষার আলো ছড়ানো সেই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠককে হারিয়ে কাঁদছে কোটি মানুষ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Mar 5, 2026 ইং
শিক্ষার আলো ছড়ানো সেই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠককে হারিয়ে কাঁদছে কোটি মানুষ ছবির ক্যাপশন: দৈনিক চেতনার কণ্ঠ
ad728


আকতারুজ্জামান, 
রাজশাহী, জেলা, প্রতিনিধি 


জনপদের আলোকিত এক মানুষ আব্দুর রাজ্জাক মাস্টার। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে তরুণ-যুবকদের সংগঠিত করেছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর নিজ এলাকায় গড়ে তোলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাজার হাজার পরিবারে ছড়িয়ে দেন জ্ঞানের আলো। কোটি মানুষের হৃদয়ে শোকের ছায়া ফেলে রাজশাহীর তানোর উপজেলার এই গুণী মানুষ চিরবিদায় নিয়েছেন।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) দুপুর সাড়ে ১২টায় নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে ৮২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বুধবার (৪ মার্চ) দুপুরে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে, চার মেয়ে, অসংখ্য শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক মাস্টারের বাসা রাজশাহীর তানোর উপজেলার তালন্দ গ্রামে। তিনি ১৯৪৪ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন মালদহ জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের শিবিরের হাট এলাকা) পিরোজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা দেরাশতুল্লাহ মন্ডল ও মাতা সাহেরা বিবি। পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার ভাই জালাল উদ্দিনও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। শিক্ষকতা পেশার কারণে তিনি এলাকায় ‘রাজ্জাক মাস্টার’ নামেই সুপরিচিত ছিলেন। তার এফএফ নম্বর ০১৮১০০০১৫৩৩ এবং লাল মুক্তিবার্তা নম্বর ০৩০২০৮০০০৫।
জানা যায়, ১৯৬৬ সালে ছাত্রজীবন শেষ করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়ানোর উদ্দেশ্যে আব্দুর রাজ্জাক তানোরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি সমাজ সংস্কারমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৩৯ বছর তিনি নিজ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৫ সালে তালন্দ আনন্দ মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে পরে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। প্রজ্ঞা, মেধা ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে অল্প সময়েই তিনি এলাকায় ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই দেশের মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন তিনি। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তানোর থেকে রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিজ জন্মস্থান সুন্দরপুর এলাকায় যান। সেখান থেকে ৫-৬ জনকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারতের মালদহ জেলার জঙ্গিপুরের স্যাকারিপুরে পৌঁছান। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা সন্তোষ মৈত্রের পরামর্শে পুনরায় দেশে ফিরে আরও মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহে উদ্যোগী হন তিনি।
পরবর্তীতে আরও ২০-২২ জন তরুণকে নিয়ে গৌড়বাগান ইয়ুথ ক্যাম্পে ভর্তি করিয়ে মূল প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। ক্যাম্পে অবস্থানকালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে আসা তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে বক্তব্য দেন এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।
২০০৪ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তালন্দ ললিত মোহন ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠায়ও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি দীর্ঘদিন কলেজটির গভর্নিং বডির প্রতিষ্ঠাতা বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মৃত্যুর আগে ঢাকা মেইলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন। ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তানোর থেকে রাজশাহীতে গেলে গণি দারোগার সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমাকে বলেন, আপনি লিস্টেড, আপনার নাম তিন নম্বরে আছে। এক নম্বরে আছে মুন্ডুমালার মতিউর রহমান। সেদিনই রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলে যাই। সেখানেও আমার নাম কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার খবর পাই। সেদিন রাতেই মায়ের সঙ্গে দেখা করে ছোট ভাইসহ ৫-৬ জনকে নিয়ে ভারতে চলে যাই।”
তার ইন্তেকালের খবর ছড়িয়ে পড়লে মঙ্গলবার তানোরের তালন্দ এলাকায় তার বাসভবনে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বজন, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা শেষবারের মতো তাকে দেখতে আসেন।
বুধবার অনুষ্ঠিত জানাজার নামাজে লাখো মানুষ অংশ নেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অংশ হিসেবে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এবং জাতীয় পতাকা দিয়ে মরদেহ আচ্ছাদিত করা হয়।
এ সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা. নাঈমা খাতুনসহ বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
জানাজার নামাজে ইমামতি করেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। জানাজার সময় কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রিয় এই মানুষটিকে শেষ বিদায় জানান হাজারো মানুষ।
জানাজা পূর্ব বক্তব্যে ড. ইঞ্জিিনিয়ার মো. শামসুল হক জহির বলেন, “আজ আমরা বিদায় জানাচ্ছি আমাদের প্রিয় আব্দুর রাজ্জাক মাস্টারকে—এই জনপদের কৃতি সন্তান, একজন আদর্শ শিক্ষক এবং সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারিগর।”
আকতারুজ্জামান, রাজশাহী জেলা প্রতিনিধ 
01761899117

নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চেতনার কন্ঠ

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
রিকশাচালককে গুলি করে হত্যা মামলায় কারাগারে চিকিৎসকসহ পাঁচজন

রিকশাচালককে গুলি করে হত্যা মামলায় কারাগারে চিকিৎসকসহ পাঁচজন